আজ বৃহস্পতিবার। ১৮ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ। ৫ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ। ৮ই শাওয়াল, ১৪৪৫ হিজরি। এখন সময় রাত ১০:৫৬

রানা প্লাজা ধসে অঙ্গহানি শিল্পী আক্তারের মানবেতর জীবন-যাপন

রানা প্লাজা ধসে অঙ্গহানি শিল্পী আক্তারের মানবেতর জীবন-যাপন
নিউজ টি শেয়ার করুন..

সাইফুল ইসলাম,বিশেষ প্রতিনিধিঃ-
সবকিছু যেন ভেঙে গায়ে পড়ছে। প্রায়ই রাতে ঘুমের ঘরে চিৎকার করে উঠি। সেই দিনের কথা মনে পড়লে আজও শরীর শিউরে উঠে। ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে অন্ধকারে তিনদিন-তিনরাত চাপা পড়েছিলাম। বের হওয়ার সুযোগ ও সাধ্য কোনটাই ছিল না। চিৎকার দিলেও কেউ শোনেনি। ক্ষুধা আর চাপা পড়া হাতের যন্ত্রণায় ছটফট করেছিলাম। বলতেছিলাম আল্লাহ আমাকে রক্ষা করো।

২০১৩ সালে ২৪শে এপ্রিল রানা প্লাজা ধসে, হাত হারানো গার্মেন্টস শ্রমিক শিল্পী আক্তার এভাবেই তুলে ধরেন মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাওয়া সেই দুঃসহ দিনের স্মৃতি। সেই স্মৃতি এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় তাকে। ঘুমের ঘরেও পিছু ছাড়ে না সেই দুঃস্বপ্ন।

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার তারাইল গ্রামের পুত্রবধূ শিল্পী আক্তার। সন্তান ও স্বামীকে নিয়ে জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় যান। পরে সাড়ে ৩ হাজার টাকা বেতনে সাভারের রানা প্লাজার চতুর্থ তলায় অবস্থিত ফ্যানটম ট্যাক লিমিটেড পোষাক কারখানায় ফিনিশিং হেলপার হিসেবে দূর্ঘটনার ৬ মাস আগে চাকুরিস্থলে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ভবন ধসের আগের দিন তার স্বামী অসুস্থ্য থাকার কারণে ডিউটি করতে যাননি। প্রতি মাসের ২৪ তারিখে ওভারটাইমের বেতন শীট তৈরী করা হয়। তাই সকলের মতো শিল্পীও সে দিন অসুস্থ্য স্বামীকে বাসায় রেখে হাজিরা দিতে কাজে গিয়েছিলেন। কিন্তু সব কিছুই যেন উলোট-পালট হয়ে যায়।

সেই দুঃসহ দিনের কথা মনে করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে শিল্পী আক্তার বলেন, ‘অন্যান্য দিনের মত, সেদিন অফিসে গিয়েছিলাম। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। বিকট শব্দ শুনতে পাই। কিছুক্ষণ পর ঝাঁকুনি দিয়ে কিছু বুঝে উঠার আগেই ধসে পড়ে ভবন। আস্তে আস্তে হাতের উপর অনুভব করি ভারি কোন বস্তুর উপস্থিতি। ক্রমেই বন্ধ হয়ে আসে নিঃশ্বাস। কয়েক ঘন্টা পর চাপা পড়া হাতে প্রচন্ড ব্যথা শুরু হয়। ব্যথার যন্ত্রণায় চিৎকার করতে থাকি। অন্ধকারে চারিদিকে শোনা যায় শুধু মানুষের বাঁচার আকুতি। দু’দিন পরেই নাকে আসে পঁচা লাশের প্রচন্ড দূর্গন্ধ। এভাবে বিনা খাবারে ধ্বংসস্তুপের মধ্যে মেশিনের নিচে ৭২ ঘন্টা চাপা পড়েছিলাম। ডান হাত মেশিনের নিচে পড়ে থেতলে যায়। তিনদিন পর উদ্ধারকর্মীরা কাছে গিয়ে বলেন হাত কেটে বের করতে হবে। প্রথমে আমি রাজি না হলেও, পরে রাজি হই। তিন দিন পর আমাকে উদ্ধার করে সাভার সেনানিবাস হাসপাতালে ভর্তি করেন উদ্ধারকর্মীরা।

গতকাল শিল্পী আক্তারের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, ডান হাত হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। এক হাত দিয়েই রান্না-বান্নাসহ সংসারের যাবতীয় কাজ করছেন। এখনো তার শরীরে নানা ধরণের সমস্যা রয়েছে। নিয়মিত খেতে হয় ওষুধ। সরকারের পক্ষ থেকে শিল্পী আক্তার ১০ লক্ষ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র পেয়েছেন। সেখান থেকে প্রতিমাসে প্রায় ১০ হাজার টাকার মতো পান এবং অসুস্থ্য স্বামী ওহিদ বিশ্বাস বাড়ির পাশে একটি মুদি দোকান নিয়ে বসেছেন। এভাবেই কোন মতে চলছে শিল্পীর সংসার ও তিন ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার খরচ এবং নিজের ওষুধ কেনা।


নিউজ টি শেয়ার করুন..

সর্বশেষ খবর

আরো খবর