আজ রবিবার। ৩রা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ। ১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ। ২১শে শাবান, ১৪৪৫ হিজরি। এখন সময় সকাল ৬:২৫

হাসপাতাল নির্মানে অনিয়ম : ১০ ইঞ্চির দেয়ালের স্থলে ৩ ইঞ্চি

হাসপাতাল নির্মানে অনিয়ম : ১০ ইঞ্চির দেয়ালের স্থলে ৩ ইঞ্চি
নিউজ টি শেয়ার করুন..

আজিজুল ইসলাম সজীব,হবিগঞ্জ প্রতিনিধি :

দুদকের অনুসন্ধানে মিলেছে অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা। শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টায় ব্যস্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দেশ উন্নয়ন লি. ও গণপূর্ত বিভাগ। নিজেদের রক্ষায় শুরু করেছেন বিভিন্নস্থানে দৌড়ঝাঁপ। তবে আগামী ২৮ মে আবারো ভবনের বিভিন্ন অংশে অনুসন্ধান চালাবে দুদক। সংবাদ প্রকাশের পর নিজেদের রক্ষা করতে ৩ ইঞ্চির ভিট লেভেল গাঁথুনির ভেতরের অংশে আরো ১০ ইঞ্চি দেয়াল নির্মাণ করে প্রতিষ্ঠানটি।
সাংবাদিকদের এর দেখানো স্থানে অভিযান চালিয়েই পাওয়া যায় অনিয়মের চিত্র। তবে এই অনিয়মকেও শতভাগ স্বচ্ছ কাজ হয়েছে বলে দাবী করলেন গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সা’দ মোহাম্মদ আন্দালিব ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প ইঞ্জিনিয়ার হাবিবুর রহমান হাবিব।

জানা যায়, ২০১৪ সালে হবিগঞ্জ শহরের নিউ ফিল্ড মাঠে জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত সমাবেশে জেলা সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য এডভোকেট মো. আবু জাহির হবিগঞ্জের অবহেলিত জন সাধারণের উন্নত চিকিৎসার জন্য ১শ শয্যার আধুনিক সদর হাসপাতালটিকে ২শ ৫০ শয্যায় উন্নীত করে একটি মেডিক্যাল কলেজ ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান প্রধানমন্ত্রীর কাছে।
তাঁর দাবির প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উভয় দাবি মেনে নিয়ে হাসপাতালটিকে ২শ ৫০ শয্যায় উন্নীত করে মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের ঘোষণা দেন। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর দ্রুত অনুমোদন পেয়ে ২শ ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ। আর এই হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণের জন্য হবিগঞ্জ গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে চট্টগ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দেশ উন্নয়ন লি. ২০১৫ সালের শুরুর দিকে ১৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ২শ ৫০ শয্যা বিশিষ্ট ৬ তলা ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু করে। ওই ভবনের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ।
ইতোমধ্যে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী এটি উদ্বোধনও করেছেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যথা সময়ে নির্মাণ কাজ শেষ না করতে পারায় ভবনটি উদ্বোধনের পূর্বে বেশ কয়েক বার তারিখ পরিবর্তন করা হয়েছিল। আর এই সুযোগে তড়িঘড়ি করে কাজ করার ফলে দুর্নীতির মাত্রা আরো বেড়ে যায়।

২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালের ভবন নির্মাণ কাজের দুর্নীতির বিষয়ে ২য় দফা তদন্তে করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এরই অংশ হিসেবে মঙ্গলবার (১৫ মে) আবারো ভবনটিতে অনুসন্ধান চালায় প্রতিষ্ঠানটি। সেই সাথে বেশ কিছু স্থানে ভবন ভেঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।

ওই পরীক্ষাতেই বেড়িয়ে আসে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভবনের মূল ভিট লেভেল দেয়ালে ১০ ইঞ্চির স্থলে ৩ ইঞ্চি কাজ করার অনিয়মটি।

তবে তদন্তে রহস্যজনক ভাবে বেড়িয়ে আসে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি ১০ ইঞ্চির স্থলে ১৫ ইঞ্চি দেয়াল নির্মাণ করার বিষয়টি। এখানেও সাধারণ মানুষের মাঝে নতুন করে প্রশ্ন জাগে কোন স্বার্থে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দেশ উন্নয়ন লি: ৫ ইঞ্চি দেয়াল বেশি নির্মাণ করেছ। অনেকেই প্রশ্ন ছুড়েন তাহলে কি ঠিকাদার অন্য স্থানে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করেছেন? এমন এখন সবার মুখে।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করে বলেন, ভবনটির নির্মাণ কাজ চলাকালীন সময়ে হবিগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সা’দ মোহাম্মদ আন্দালিব, তৎকালীন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মুকুল চন্দ্র দাস, উপ-সহকারী প্রকৌশলী গোলাম মস্তোফাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রায় প্রতিদিন পরিদর্শন করলেও তাদের চোখে একেবারেই ধরা পড়েনি বিষয়টি।
তাঁরা যেন দেখেও না দেখার ভান করতেন। তাদের অভিযোগ এমন অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে কাজ করার সুযোগ করে দিয়ে তাঁরাও কামিয়ে নিয়েছেন মোটা অঙ্কের টাকা।

স্থানীয়দের দাবী, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সা’দ মোহাম্মদ আন্দালিব, তৎকালীন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মুকুল চন্দ্র দাস, উপ-সহকারী প্রকৌশলী গোলাম মস্তোফাসহ সংশ্লিষ্টদের ব্যাপারে তদন্ত চালালেই বেড়িয়ে আসবে তারা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কি পরিমাণ অবৈধ সুযোগ-সুবিধা নিয়ে টাকার পাহাড় গড়েছেন।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ৩০ মে জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন পত্রিকায় ‘হবিগঞ্জে নির্মাণাধীন ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট আধুনিক সদর হাসপাতালের নির্মাণ কাজে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে’ মর্মে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে দুদকের প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে তদন্ত নামে দুদক। এরই ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার (৭ মে) দুপুরে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক হবিগঞ্জের উপ-পরিচালক অজয় কুমার সাহার নেতৃত্বে প্রথম দফা তদন্ত শুরু করেন কর্মকর্তারা।

এ সময় ভবনটির চার পাশে ঘুরে দেখেন তারা। ভবনের বিভিন্ন দিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করেন কর্মকর্তারা। এ জন্য একজন নিরপেক্ষ প্রকৌশলীকে আনা হয় তদন্তে গঠিত কমিটির পক্ষ থেকে। আর এই তদন্তে সহযোগিতা করার জন্য প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবেদক আবু হাসিব খান চৌধুরী পাবেলকে লিখিতভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

গত ২ ও ৫ মে হবিগঞ্জ দুর্নীতি দমন কমিশনের উপ-পরিচালক অজয় কুমার সাহার স্বাক্ষরিত পত্রে বলা হয়, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দেশ উন্নয়ন লি: কর্তৃক ২৫০ শয্যা হবিগঞ্জ আধুনিক সদর হাসপাতালের নতুন ভবন (বর্তমানে শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ) হাসপাতাল হবিগঞ্জ এর নির্মাণ কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতি সংক্রান্ত প্রকাশিত রিপোর্টের ভিত্তিতে ইতিমধ্যে অনুসন্ধান কাজ চলমান রয়েছে।

প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী নমুনা স্বরূপ ভবনের কিছু অংশ পরিমাপ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সংবাদ কর্মীদেরকর্মীদেরত দেখানো মতে ভবনের জায়গার পরিমাপ কাজ নিরপেক্ষ প্রকৌশলী কর্তৃক গ্রহণ করা হয়। এরই প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার দুপুরে আবারো ভবনের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখবে তদন্ত টিম। এবং একই সাথে ভবনের বিভিন্ন অংশে আংশিক ভেঙ্গে দেখা হয় কি পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে।

দুদকের উপ-পরিচালক অজয় কুমার সাহা বলেন, আমাদের তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত আছে। এখনই সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না কি পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে। তিন ইঞ্চ ভিট লেভেল গাঁথুনির বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা বাহিরে তিন ইঞ্চ ব্রিক দেয়াল পেয়েছি আবার এর ভিতরে আরো ১০ ইঞ্চির একটি দেয়াল পাওয়া গেছে। সেই সাথে আলাদা প্লাস্টারও পেয়েছি। সব মিলিয়ে ওই স্থানে ১৫ ইঞ্চির দেয়াল পাওয়া গেছে। তবে এখানে অনেকেই প্রশ্ন করেছেন ঠিকাদারি ইষ্টি মিটে ১০ ইঞ্চি দেয়াল দেয়ার কথা ছিল কিন্তু কি কারণে এখানে ১৫ইঞ্চি দেয়াল দেয়া হয়েছে তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বলা যাবে না।
আজ সন্ধ্যা ৭ ঘটিকার সময় এসব বিষয়ে স্পষ্ট করেন এবং বলেন দুর্নীতির অভিযোগের প্রমান পাওয়া গেছে। তিনি আরো বলেন, আগামী ( ২৮ মে) আবারো ভবনের অন্যান্য অংশে অনুসন্ধান চালানো হবে। ওইসব অংশে কোন অনিয়ম হয়েছে কিনা তাও দেখা হবে। অনিয়ম দুর্নীতি করে কেহ পাড় পাবে না বলেও তিনি হুশিয়ারি দেন।

নিউজ টি শেয়ার করুন..

সর্বশেষ খবর

আরো খবর