আজ বৃহস্পতিবার। ১৮ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ। ৫ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ। ৮ই শাওয়াল, ১৪৪৫ হিজরি। এখন সময় রাত ১০:৫৭

আমি নারী, প্লিজ আমাকে মানুষ হিসাবে ভাবুন.!

আমি নারী, প্লিজ আমাকে মানুষ হিসাবে ভাবুন.!
নিউজ টি শেয়ার করুন..

আমি নারী। এটাই বড় বা আসল পরিচয় নয়।আমার বড় পরিচয় আমি মানুষ। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব।এই বিশ্বসভ্যতা আমাকে দিয়ে পূর্ণতা পেয়েছে।শুধু জৈবিক চাহিদা পূরণ বা সন্তান উৎপাদনে নয়,সভ্যতার বিকাশে পুরুষের পাশাপাশি আমি রাখি গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম দুঃসাহসের সঙ্গে বলেছেন-
“পৃথিবীতে যা কিছু সৃষ্টি চিরকল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।”

আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে আমাকে সহ্যই করত না সমাজ। আমি জন্ম নিলেই আমাকে জীবন্ত পুঁতে ফেলা হতো।সেই যুগটা ছিল কতটা বর্বর।সেই যুগ পেরিয়ে এলোও এখনো বিভিন্ন সময়ে খবর পাওয়া যায়, চরম নিকৃষ্টতার সঙ্গে নারী নিগ্রহের ঘটনা।তাছাড়া আবর সমাজের কথা নাহয় বাদ দিলাম এই উপমাহাদেশে মৃত স্বামীর সঙ্গে আগুনে পড়ে মারা হতো আমি নারীকে।এই উপমহাদেশে মৃত স্বামীর সঙ্গে আগুনে পুড়ে মরার সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে।কিন্তু এত কিছুর পরও আমি কি স্বাধীন? পৃথিবী কি আমার জন্য নির্বিঘ্ন।উত্তর নিশ্চয়ই হ্যাঁ নয়। এখনো ভারতের মতো সভ্য দেশে ট্রেনের ভেতরে নারীকে গণধর্ষণের খবর পাই, মিয়ানমারের আরাকানে রোহিঙ্গা নারীর স্তন কেটে ফেলার সংবাদ পাই।তাছাড়া সারাবিশ্বে নারী নির্যাতন-ধর্ষণের ঘটনা পাই।

কেন কেন কেন আমার উপর এত জুলুম, এত লোলুপ দৃষ্টি,কেন এত প্রতিশোধপরায়নতা বলতে পারেন আমার উপর.?এর কারন আমার শরীর।আমার শরীরটা আসলেই কাল।আমার শরীরটা আসলে প্রধান প্রতিবন্ধক। এই কথাগুলো আক্ষেপের হলেও এটাই তো সত্য।এই অকাট্য সত্যকে কীভাবে এড়িয়ে যাই।

ছেলে শিশুর মত আমারও একটা শৈশব আছে।সেই শৈশবে আমি কাছের লোকদের দ্বারাই নিগ্রহের শিকার হই।শৈশব পেরিয়ে আমার যখন কৈশোর জীবন শুরু হয় তখন তো আরো ভয়াবহ অবস্থা। স্কুলের বন্ধু,পাড়ার প্রতিবেশি কেউই বাদ যান না,সবার লোলুপ দৃষ্টিই থাকে আমার উপর। পথে-ঘাটে অধিকাংশ পুরুষ আমার দিকে নিরীক্ষার দৃষ্টিতে তাকান।এইসব পেরিয়েই আমাকে পা দিতে হয় যৌবনে।
একজন নারীর যৌবন হচ্ছে আগুনের মতো। এই আগুনে ঝাঁপ দিতে অঙ্গ পতঙ্গের উড়াউড়ি।আমার সম্ভ্রম নষ্ট করতে কত জনের যে ফন্দি থাকে, হয়ত সেটা এই সমাজের কারণে অধিকাংশ সময়েই বাস্তবায়ন করতে পারে না কাপুরুষরা।কিন্তু অনেক নারীকে লালসায় পতিত হতেই হয়, সেইসব খবর কখনো জনসন্মক্ষে আসে, কখনো আসে না।

আমি কখনো কখনো কুমারী থেকেই পড়াশোনার পাঠ চুকাতে পারি। কিন্তু আমার গায়ের রং দুধসাদা হলে, হলদেটে ফর্সা শরীর হলে,দেহের গড়ন অসাধারণ হলে আমাকে আর আটকাতে পারেন না বাবা মায়েরা।
অব্যাহত চাপের কারণেই আমাকে বিয়ে দিতে হয়।আর আমি যদি কালো বর্ণের হই, অসুন্দরী হই, মেধাহীন হই, তাহলে তো কথাই নেই, সমাজ আমাকে ডাস্টবিনে ছুড়ে মারে।

এই সমাজে যারা অসাধারণ প্রতিভাবান, তারা নানা কারণে অন্যদের দ্বারা আক্রান্ত হযন, প্রতিহিংসার মধ্যে পড়েন। ঠিক একইভাবে আমার মধ্যে যারা রূপসী তারাও তাদের সৌন্দর্যের কারণে অবদলিত ও অপমানিত হন।এটা আসলে এ সমাজের পুরুষদের মনস্তাত্ত্বিক অনগ্রসতার কারণেই ঘটে। কারন আমার শরীর আর পুরুষের শরীরের মধ্যে কি খুব বেশি তফাৎ আছে.?
আমার শরীরের তিন-চারটি জায়গা ছাড়া অন্য কোথাও পুরুষের সঙ্গে কোন ব্যতিক্রম নেই। এরপরও আমার প্রতি পুরুষের এই অনিরুদ্ধ কামনা, সেই যখন নিয়মকে অতিক্রম করে তখনই ঘটে বিপত্তি।

বিশ্ববিদ্যালয় যাদের আমি পিতৃতুল্য মনে করি,অনেক সময় তাদের দ্বারাই যৌন হেনস্তার শিকার হই আমি।প্রফেশনাল লাইফে আমাকে নিয়ে কানাঘুষার শেষ নেই। আমি যাদের সঙ্গে দিনরাত পরিশ্রম করি, তারাই আড়ালে আমার শরীর নিয়ে সমালোচনা করে অথবা আমার দিকে আড় চোখে তাকায়।

আমি দেখতে কেমন, আমার ঠোঁট কেমন, ব্রেস্ট কেমন,নিতন্ত কেমন- এইসব আলোচনার যেসব পুরুষ নিজেদের সময় নষ্ট করে, তাদেরকে আমার কাছে রুচিহীন মনে হয়। অথচ এদের মধ্যে যারা বিবাহিত তারা ঘরে গিয়ে তাদের স্ত্রীর চোখ, মুখ, নাক, স্তন নিয়ে প্রশংসা করে না।এরা আসলে মানুষ নয়, মনোজাগতিকভাবেই কামুক।
দার্শনিক ফ্রয়েড নারীর শরীর নিয়ে যে তথ্য ও তত্ত্ব দিয়েছেন,সেটাকে আমি বাস্তবসম্মত মনে করি না।তার তত্ত্বের যথার্থতা থাকলে এই সভ্যতা এতটা সভ্য হতে পারত না।মানুষের মনের মধ্যে অনেক নেতিবাচক দিক থাকতে পারে,কিন্তু এর বিপরীতে সবসময় ইতিবাচকতাকে জাগিয়ে রাখতে পারলেই কেবল কেউ প্রকৃত মানুষ হতে পারে।ফ্রয়েডের তত্ত্বে কেবল নেতিবাচক বক্তব্যই উপস্থাপন করা হয়েছে।

আমি নারী। আমি মানুষ।হ্যাঁ আমি জানি, পুরুষের মতো আমার শারীরিক সক্ষমতা নেই। তাই পুরুষের সঙ্গে আমি সমতা চাই না, আমার প্রয়োজন ন্যায্যতা। এই যে পাবলিক বাসে লেখা থাকে “এই সিটগুলো নারী ও শিশুদের জন্য” পুরুষের সঙ্গে সমতার প্রতিযোগিতায় গেলে আমি এই অধিকারটুকু কখনো পাবো না।
আমি শারীরিকভাবে পুরুষের চেয়ে খানিকটা দুর্বল হলেও সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ভেতর থেকে নারীর সবলত্ব।আমি সেটি অর্জনের জন্য নিরন্তর লড়াই করে যাচ্ছি।আমি নারী। আমি পুরুষের “শয্যাসঙ্গী” পরিচয় বাঁচতে চাই না,আমি চাই পুরুষের সহযোগী।
আমি যদি আপনার স্ত্রী হই,তাহলে আমাকে ব্যবহার করুন, শয্যায় নিন, আমার সঙ্গে আপনার গোপন-প্রকাশ্য সবকিছু ভাগাভাগি করুন, জীবনটাকে আমার সঙ্গে পরিচ্ছন্ন ও আনন্দময় করে তুলুন। কিন্তু আমি আপনার স্ত্রী না হয়ে অন্য নারী হলে, আমাকে অবশ্যই আপনার মা অথবা বোন অথবা আপনার কন্যা ভাবুন।
আমি নারী উত্তরাধুনিক সময়েও আমাকে পণ্য বানানো হয়।কর্পোরেট জগতে আমি হলাম প্রোডাক্ট।এই মানসিকতা,এটা এই সমাজের দৈন্যতা, এটা কেবলই সভ্যতার নীচতা। পুরুষ এবং প্রচলিত সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিকে আমার ব্যাপারে ইতিবাচক না করলে ধর্ষণ কখনো বন্ধ হবে না।
তবে এক্ষেত্রে আমিও দায়ী। অধিকাংশ সময় আমি পণ্য হতে নিজেকে বিকিয়ে বা বিলিয়ে দেই।
আমি একজন স্ত্রী স্বামীর জৈবিক চাহিদা যেমনটা মেটাই,তেমনি মা হিসেবে আমার সন্তানকে অপাত্য স্নেহ দেই,যা পৃথিবীতে বিরল। হ্যাঁ, আমাকে দোষারোপ করতে পারেন এই কারণে যে, অনেক সময়ই আমি ব্যর্থ হই। হয় স্ত্রী হিসেবে,বোন হিসেবে,কন্যা হিসেবে পুত্রবধূ হিসেবে আমি ব্যর্থ, কিন্তু একথা আমি হলফ করে বলতে পারি যে, মা হিসেবে আমি অবশ্যই আমি সফল। শুধু সফল নই পৃথিবীতে কিংবদন্তি ও বটে।
আমি নারী, প্লিজ আমাকে মানুষ হিসেবে ভাবুন। প্লিজ……..!!!

লেখকঃ আসমাউল মুত্তাকিন
মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
সাংবাদিকতা বিভাগ

নিউজ টি শেয়ার করুন..

সর্বশেষ খবর

আরো খবর