আজ শনিবার। ২০শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ। ৭ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ। ১০ই শাওয়াল, ১৪৪৫ হিজরি। এখন সময় রাত ১১:৪৭

অর্থের অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন বাউল কবি ইসলাম উদ্দিন

অর্থের অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন বাউল কবি ইসলাম উদ্দিন
নিউজ টি শেয়ার করুন..

বাউল কবি ইসলাম উদ্দিন। এক সময়ে তার গানে মানুষ মুগ্ধ হলেও আজ তিনি নিস্তেজ। কণ্ঠে নেই সেই সুমধুর সুর ও শক্তি। নানা রোগে ভোগে এখন শয্যাশায়ী নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার গুণী এই বাউল শিল্পী। অর্থের অভাবে চিকিৎসাটুকু পর্যন্ত করাতে পারছেন না। তিলে তিলে ভুগছেন মরণ যন্ত্রণায়।

স্ত্রী লিয়া খানম এবং অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া একমাত্র মেয়ে ইমু আক্তার ছাড়া আর কেউ নেই বাউল ইসলামের সংসারে। এতদিন তিনি গান গেয়ে যা উপার্জন করতেন তা দিয়েই কোনো রকমে চলত সংসার। কিন্তু গত ১১ মাস ধরে প্রথমে মাথা ও ঘাড় ব্যথায় আক্রান্ত হওয়ার পর এখন তিনি প্যারালাইসিস রোগে শয্যাশায়ী। দু’হাত ও পায়ের শক্তি দিনদিনই কমে যাচ্ছে তার।

আশি ও নব্বইয়ের দশকের তুমুল জনপ্রিয় বাউল ইসলাম উদ্দিন দেশজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠেন মূলত নন্দিত কথাসাহিত্যিক প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের সান্নিধ্য পেয়ে। ১৯৯২ সালে হুমায়ূন আহমেদের দৃষ্টিতে আসার পর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। তারপর ১৯৯২ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ২০টি বছর কাটিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদের সহচর হিসেবে। তিনি হুমায়ূন আহমেদের প্রিয় বাউলদের মধ্যে একজন। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গে কপাল ভেঙেছে বাউল কবি ইসলাম উদ্দিনেরও।

আগে হুমায়ূন আহমেদ নিয়মিত খোঁজ-খবর নিতেন। কিন্তু ১১ মাস ধরে প্যারালাইসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী অবস্থায় বসবাস করলেও কেউ তার খোঁজ নিচ্ছেন না।

এখন আঁধার ঘরেই দিন কাটছে এই বাউলের। টাকার অভাবে হচ্ছে না তার সঠিক চিকিৎসা। দর্শক মাতানো বাউল এখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে একা একা গুণ গুণ করে গান করেন। পরিচিত কোনো বন্ধু-বান্ধবের দেখা পেলে দু’চোখ অশ্রুতে ভাসান।

সরেজমিনে গিয়ে বাউল ইসলাম উদ্দিনের এই করুণ চিত্র চোখে পড়ে। জরাজীর্ণ একটি ঘরের অন্ধকারাচ্ছন্ন এক অংশে বসবাস করছেন তিনি। বিছানায় শয্যাশায়ী বাউল এ প্রতিবেদককে দেখে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। তবে কোনোভাবে উঠে বসতে সক্ষম হন। গায়ে পরানো শার্টের বোতমগুলো লাগাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু সঠিকভাবে তা লাগাতে পারেননি। রঙিন দিনগুলো বিশেষ করে হুমায়ুন আহমেদের কথা স্মরণ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন বারবার।

চিকিৎসার বিষয়ে জানতে চাইলে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন অনেকক্ষণ। পরে বলেন, একবার খেলে আরেকবারের চিন্তা করতে হয়। এই অবস্থায় আবার চিকিৎসা?

জানা গেছে, প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে প্রথমে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে দশ পনেরো দিন চিকিৎসা গ্রহণের পর অর্থ সংকটের কারণে বাড়িতে চলে আসতে হয় তাকে। বর্তমানে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওষুধ সেবন করছেন। তবে অনেক সময় টাকার অভাবে ওষুধ কিনতে পারেন না বলেও জানান তিনি।

নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার সান্দিকোণা ইউনিয়নের খিদিরপুর গ্রামে ১৯৫৬ সালে ৮ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন বাউল ইসলাম উদ্দিন। তার বাবার নাম মৃত আজমত আলী।

বাউল ইসলাম উদ্দিন ওস্তাদ আবেদ আলীসহ বাউল ইস্রাফিল, আব্দুল মজিদ তালুকদার, বাউল ইদ্রিছ মিয়া, বাউল মকবুল হোসেন সরকার, বাউল গিয়াস উদ্দিন, বাউল মাহাতাব উদ্দিন, বাউল দুদু মিয়া, বাউল সুনীল কর্মকার, বাউল শামছুন্নাহার, বাউল আব্দুস সালাম, বাউল কিতাব আলীর সঙ্গে পালা ও মালজোড়া গান করেছেন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ভারতেও তার একাধিকবার গান গাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। বাউল গান ছাড়াও কবিগান ও জারি গানেও দখল রয়েছে তার।

ইসলাম উদ্দিন শুধু বাউল নন, তিনি একাধারে একজন কবি, লেখক, অভিনেতা ও পল্লী সংস্কৃতি সংগ্রাহক। তার রচিত প্রায় সহস্রাধিক গান রয়েছে। গানের পাশাপাশি তিনি কয়েকটি গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি রচনা করলেও অর্থাভাবে প্রকাশ করতে পারছেন না। তার উল্লেখ্যযোগ্য পাণ্ডুলিপিগুলো হলো- নেত্রকোনার লোক সাহিত্য, শাফিউল মজনবীন, পদ্যাকারে মহানবীর জীবনী, নাটিকা একুশে ফেব্রুয়ারি, নেত্রকোনার আঞ্চলিক ভাষার অভিধান।

ইসলাম উদ্দিন জাতীয়ভাবে কোনো স্বীকৃতি না পেলেও ২০১৮ সালে স্থানীয় ‘চর্চা সাহিত্য আড্ডা’ সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

হুমায়ূন আহমেদের বিজ্ঞাপন- ‘বই হউক নিত্য সঙ্গী, ‘ভালো বীজে ভালো ফসল’, নাটক- ‘মন্ত্রী মহোদয়ের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’, ‘উড়ে যায় বক পক্ষী’, ‘এনায়েত আলীর ছাগল’, ‘অদেখা ভুবন’, ‘চন্দ্র কারিগর’ এবং উল্লেখযোগ্য সিনেমা- ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’ ও ‘ঘেটুপুত্র কমলায়’ কাজ করেছেন ইসলাম উদ্দিন।


নিউজ টি শেয়ার করুন..

সর্বশেষ খবর

আরো খবর