আজ শনিবার। ২০শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ। ৭ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ। ১০ই শাওয়াল, ১৪৪৫ হিজরি। এখন সময় রাত ১১:৩৪

নানা সমস্যায় জর্জরিত নোবিপ্রবি’র  আব্দুস সালাম হল

নানা সমস্যায় জর্জরিত নোবিপ্রবি’র  আব্দুস সালাম হল
নিউজ টি শেয়ার করুন..

নোবিপ্রবি প্রতিনিধিঃ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) বছরের পর বছর ছাত্র সংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেদের হল।নতুন করে দুটি হলের নির্মাণ কাজ অনেকদিন ধরে চললেও হল নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের অবহেলার কারণে চার বছরের অধিক সময়েও হলের কাজ শেষ হয়নি। বর্তমানে ছেলেদের জন্য একমাত্র আবাসিক হল ভাষা শহীদ আব্দুস সালাম হল। ২০১১ সালে হলটি নির্মাণ করা হয়।দুই ব্লকের চারতলা বিশিষ্ট হলটিতে মোট কক্ষ রয়েছে ৯০টি।

ছাত্রদের জন্য বরাদ্দকৃত কক্ষের সংখ্যা ৮৭। বাকি তিনটি কক্ষের একটি প্রাধ্যক্ষ অফিস, একটি কর্মকর্তাদের অফিস আরেকটি অতিথি কক্ষ। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। ছাত্রদের জন্য ৮৭ টি কক্ষে ৪ জন করে মোট আসন সংখ্যা ৩৪৮ টি আসনের বিপরীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় আট শতাধিক। প্রতি কক্ষে ৪ জন করে আবাসন ব্যবস্থা করা হলেও বর্তমানে কক্ষ-ভেদে থাকছেন ছয় জন করে।কোনো রুমে তারও বেশী।আসন বণ্টনে হল প্রাধ্যক্ষের কোনোরকম তদারকিও নেই।

এতে করে পড়াশোনার চরম ব্যাঘাত ঘটছে বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ। এছাড়া, হল অফিসের তথ্য মতে ৩৪৮ টি আসনের বিপরীতে মাত্র ৩৫ জন নিবন্ধিত শিক্ষার্থী রয়েছে। অ-নিবন্ধিত শিক্ষার্থী সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনিয়ন্ত্রিত বহিরাগত প্রবেশের কারণে অধিকাংশ সময় হলের শিক্ষার্থীদের মোবাইল,ল্যাপটপ, মানিব্যাগ, এমনকি রুমের ফ্যান পর্যন্ত চুরিসহ বহিরাগতদের মাদকসহ প্রবেশ ও গ্রহণের অভিযোগও পাওয়া গেছে।

আসন সংকট, ডাইনিংয়ে অনিয়ম,রিডিংরুম সংকট, খেলাধুলার সরঞ্জামের অনুপস্থিতি,অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, টয়লেট-বাথরুমের জঘন্য অবস্থা, হলের আশেপাশে ময়লার স্তুপ ইত্যাদি মিলিয়ে অব্যবস্থাপনার আখড়ায় পরিণত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেদের একমাত্র আবাসিক হল ভাষা শহীদ আব্দুস সালাম হল। বিভিন্ন বিষয়ে হল প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও সমাধান না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন একাধিক শিক্ষার্থী।

এছাড়াও হলের সমস্যা সমাধানে শিক্ষার্থীরা একাধিকবার আন্দোলন করলেও আজও পর্যন্ত হলের কোন সমস্যার সমাধান হয়নি। প্রশাসন থেকে বারবার আশ্বাস দিলেও তা আর কাজে পরিণত হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হলের একাধিক আবাসিক শিক্ষার্থী জানান, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেদের জন্য আবাসিক হল একটি।সেই হলের যদি এমন বেহাল দশা হয় তাহলে আমরা কোথায় যাব? খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া হলে অফিস করেন না হলের প্রভোস্ট,সহকারী প্রভোস্ট কেউই।

হলের ডাইনিংয়ের ব্যাপারে হল প্রশাসনের কোন খবরদারি নেই। কোন কোন মাসে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণেই ডাইনিংয়ে একজন বা দুইজন ম্যানেজার ঠিক করা হয়। তাদের কাছে শিক্ষার্থীরা টাকা জমা দেন এবং খাবার খান। আবার কোন মাসে ম্যানেজার ঠিক করা না গেলে পুরো মাস ডাইনিংই বন্ধ থাকে।প্রশাসন কর্তৃক ডাইনিংয়ে দেওয়া হয় না কোন ভর্তুকি। শিক্ষার্থীদের চাঁদার ওপরই চলে ডাইনিংয়ের চাকা।এতে করে মাঝে মাঝেই টাকার অভাবে অফ হয়ে যায় ডাইনিং।তখন শিক্ষার্থীদের খাওয়ার জন্য নির্ভর করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশের টং দোকানগুলোর বেশি দামে অতি নিম্নমান এবং অস্বাস্থ্যকর খাবারের উপর। দোকান বা ক্যান্টিনের খাবারের দোকানের খাদ্যের কোন মূল্য নির্ধারণ বা নিয়ন্ত্রণও নেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নানান অপ্রতুলতার মাঝে হলের আসন সংকটকে কপালের লিখন বলে মেনে নিলেও পড়াশুনা করার জন্য রিডিং রুমের অপ্রতুলতাকে মেনে নিতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা।হলের রিডিংরুম রয়েছে মাত্র একটি।যেখানে নেই পড়াশোনার জন্য পর্যাপ্ত টেবিল, পড়াশোনার টেবিলের চেয়ে পত্রিকা পড়ার টেবিলের সংখ্যা বেশি দেখা যায়।

কিন্তু, পত্রিকার টেবিলগুলোতে দেখা যায় না কোন পত্রিকা।এছাড়াও,রিডিংরুমে নেই পর্যাপ্ত লাইট, ফ্যান।যা আছে সেগুলোও বিকল হয়ে পড়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য ড. এম. অহিদুজ্জামান যোগদানের পর রিডিং ও ডাইনিং রুমের প্রতিটি ফ্যান ও লাইটের নতুন করে লাগিয়ে দেন। নতুন টেবিল চেয়ারের ব্যবস্থা করলেও অব্যবস্থাপনার কারণে অধিকাংশ লাইট ফ্যানই গায়েব অথবা নষ্ট হয়ে গেছে। এদিকে হলের প্রতি ব্লকের জন্য আলাদা ট্যাংক এর ব্যবস্থা থাকলেও তা নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না এবং ট্যাংকের উপরের ঢাকনা না থাকার কারণে, দিনের পর দিন এই অপরিষ্কার-অস্বাস্থ্যকর পানিই শিক্ষার্থীরা ব্যবহার করে চলেছেন।

বিশাল এই হলে শিক্ষার্থীদের খাবার পানির জন্য দুটি ট্যাংক রয়েছে হলের নিচ তলায় ডাইনিং রুমে, বিশেষ শোধনের মাধ্যমে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করা হলেও,সেই ট্যাংকগুলোর আশেপাশে দেখা যায় অত্যন্ত নোংরা পরিবেশ। সেখানে দেখা যায়, পঁচা-বাসি জিনিস পড়ে পোকামাকড় গিজগিজ করছে। পানির লাইন ফেটে পানিতে ভেসে আছে ট্যাংক এর আশপাশ।

হলের টয়লেট গুলোর অবস্থা খুবই জঘন্য। সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিটি ফ্লোরেই বাথরুমগুলোর ছিটকিনি খসে পড়েছে, কমোড-পানি সাপ্লাই, ভাঙা কল, দরজাগুলো ভাঙ্গা-অর্ধভাঙ্গা হয়ে ঝুলে আছে। এ যেন রাস্তার পাশের পাবলিক টয়লেটের চেয়েও বেহাল দশা। ধারণক্ষমতার তুলনায় অধিক শিক্ষার্থী থাকার কারণে প্রতি সপ্তাহে একবার পরিষ্কার করার করলেও আবার নোংরা দুর্গন্ধ হয়ে যায়। হল কর্মচারীদের অভিযোগ, যেখানে পুরো হলে চারজন পরিচ্ছন্নতা কর্মী দরকার সেখানে মাত্র দুইজন পরিচ্ছন্নতা কর্মী আছে। তাদের মধ্যে আবার একজন শারীরিক ভাবে অসুস্থ। স্বল্প সংখ্যক জনবল দিয়ে পুরো হল পরিষ্কার রাখা সম্ভব হয় না।

এছাড়াও যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে হল অভ্যন্তরের কক্ষ, করিডোর, বাথরুম-টয়লেট, ডাইনিং রুম, রিডিং রুমের লাইট-ফ্যান-সুইচ ইত্যাদি প্রায়শই নষ্ট হয়ে থাকে। এসব নিয়ে হল প্রশাসনের কাছে একাধিকবার অভিযোগ করেও কোন সাড়া পাওয়া যায় না।সাড়া আসলেও দুতিন সপ্তাহ পর আসে।এদিকে হলের আশেপাশে দেখা যায় বিভিন্ন জায়গা ময়লার স্তূপে পরিণত হয়ে রয়েছে। এসব বিষয়ে যেন দেখার কেউ নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধ স্টাডিজ বিভাগের আবাসিক শিক্ষার্থী আক্তারুজ্জামান জিসান বলেন, হলে সমস্যার শেষ নেই। অনেক ধরনের সমস্যা আছে। এসব বিষয় বারবার অভিযোগ করেও যখন কোন কিছুই হয় না তখন আর অভিযোগ করতে ইচ্ছে করে না। আমাদের হল একটি। এই হলটির দিকে যখন প্রশাসন নজর দেয় না তখন নিজেদের ভাগ্যকে দোষারোপ করা ছাড়া আমাদের কিছু করার নেই।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে হলের প্রভোস্ট(ভারপ্রাপ্ত) সোহেল রানা বলেন, পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেদের জন্য যেহেতু হল একটা তাই এই হলের উপর চাপ পড়ে বেশি। হলের সার্বিক বিষয় নিয়ে আমরা কর্তৃপক্ষ অনেকবার বসেছি এবং অনেকগুলো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে আমরা সকল বিষয়গুলো সমাধান করার চেষ্টা করছি। সবগুলো সমস্যা পর্যায়ক্রমে সমাধান করা হবে।তবে এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের আরো বেশি সচেতন হতে হবে।পরিচ্ছন্নতা কর্মী সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন,শীঘ্রই আরো ২ জন পরিচ্ছন্নতা কর্মী নিয়োগ দেয়া হবে।আশা করি সমস্যাগুলো খুব দ্রুতই সমাধান হয়ে যাবে।


নিউজ টি শেয়ার করুন..

সর্বশেষ খবর

আরো খবর