আজ রবিবার। ৩রা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ। ১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ। ২১শে শাবান, ১৪৪৫ হিজরি। এখন সময় ভোর ৫:৫৯

বরগুনায় প্রতি মাসে গড়ে ১০ জন আত্মহত্যা করে

বরগুনায় প্রতি মাসে গড়ে ১০ জন আত্মহত্যা করে
নিউজ টি শেয়ার করুন..

বরগুনায় ২০২২ সালে ১২৪ জন আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে বেশির ভাগই নারী। তাঁদের মধ্য ৫৮ জনই অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড বা গ্যাস ট্যাবলেট নামের একপ্রকার কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। বরগুনা সদর হাসপাতালের গত একবছরের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট থেকে তথ্য জানা গেছে। 

জেলার সচেতন নাগরিকেরা মনে করছেন, আত্মহত্যার মতো সামাজিক অবক্ষয় রোধে প্রয়োজনীয় সচেতনতার অভাব ও কীটনাশকের সহজলভ্যতার কারণেও আত্মহত্যা প্রবণতা এখন উদ্বেগ জনক। 

বরগুনা সদর হাসপাতালের ময়নাতদন্ত রিপোর্টের তথ্যমতে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বরগুনায় মোট ১৪৯টি অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১২৪ জনের রিপোর্ট এসেছে সুইসাইডাল ডেথ বা আত্মহত্যা। এর মধ্যে৭৬ জনই নারী, বাকিরা পুরুষ। নারীদের ৪২ জনই কীটনাশক (গ্যাস ট্যাবলেট) খেয়ে এবং বাকি ২৪ জন গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। এসব নারীর বয়স ১৫ থেকে ৩২ বছর।

ছাড়া একই বছর আত্মহত্যাকারী ৪৮ জন পুরুষদের মধ্যে ৩২ জন গলায় ফাঁস এবং ১৬ জন কীটনাশক (গ্যাস ট্যাবলেট) খেয়ে আত্মহত্যা করেন। তাঁদের বয়স ২৫ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে। সজীব নামের ১৩ বছরের এক কিশোরও আছে এই তালিকায়। 

বরগুনায় ২০২২ সালের আলোচিত আত্মহত্যার ঘটনাগুলো

২০২২ সালে বরগুনায় সবচেয়ে আলোচিত অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল বেতাগী উপজেলায়। উপজেলার জোয়ার করুণা গ্রামের গ্রামের বাসিন্দা হিরু হাওলাদারের মেয়ে তামান্না মনির হাওলাদারের ছেলে আসলামের প্রেমের সম্পর্ক থেকে বিয়ে হয়। ছেলেরপ রিবার মেনে নিলেও মেয়ে তামান্নার পরিবারের কেউ বিয়ে মেনে নেননি। ২০২২ সালের ১৩ মার্চ উভয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। 

একই বছরের ২৭ জুলাই বরগুনা সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের পোটকাখালী গ্রামে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া শারমিন নামে এক ছাত্রী আত্মহত্যা করে। শারমিনের বয়স মাত্র ১২ বছর। ঘরে ওড়না পেঁচিয়ে সে আত্মহত্যা করে। 

 ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বরগুনা সদর উপজেলার বদরখালী ইউনিয়নের বাওলাকার গ্রামে সুরমা (১৭) নামের এক মাদ্রাসা ছাত্রীর বিয়ে হয়। বাবা শাহ আলম সিকদার এক প্রকার মতের বিরুদ্ধেই তাঁর মেয়ে সুরমাকে পাশের গ্রামের নির্মাণ শ্রমিক বশিরের সঙ্গে বিয়ে দেন। পড়াশোনা করে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন মুহূর্তেই ফিকে হয়ে যায় সুরমার। নববধূ হয়ে লাল শাড়িপরে চলে মাদ্রাসার বদলে তাঁকে চলে যেতে হয় শ্বশুরবাড়ি। 

এরপর কিছুদিন যেতে না যেতেই যৌতুকের চাপে চলে আসতে হয় বাবার বাড়ি। টাকা নিয়ে তবেই ফিরতে হবে শ্বশুরালয়ে, নয়তো নির্যাতনের শিকার হতে হবে। কিন্তু সুরমা যৌতুক দিয়ে স্বামী সংসারে যেতে ছিল নারাজ। নিয়ে বাবার সঙ্গে তার বাগ্‌বিতণ্ডাহয়। একপর্যায়ে বাবা রেগে গিয়ে হাত তোলেন মেয়ের গায়ে। অভিমানে কীটনাশক পান করে আত্মহত্যা করে সুরমা। 

সুরমার মতোই উপকূলীয় বরগুনা জেলার উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যক কিশোরী গৃহবধূ পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। 

বরগুনায় ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আলোচিত আত্মহত্যার ঘটনাগুলো এদিকে হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু২০২৩ সালের জানুয়ারি ফেব্রুয়ারিতে বরগুনায় মোট ১৯টি অপমৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টিই আত্মহত্যা। বাকি ছয়জন রোগাক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। 

২০২৩ সালের জানুয়ারি পাথরঘাটা উপজেলার নাচনাপাড়া এলাকায় পারিবারিক কলহের জেরে দুই সন্তানের মা সাবিনা বেগমফুর্তি (২৮) গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। 

এরপর জানুয়ারি সদরের তানজিলা আক্তার পুতুল নামের এক গৃহবধূ, জানুয়ারি রাব্বি খান নামের এক কিশোর, ৯ জানুয়ারি মাত্র আমতলী উপজেলার হুলাটানা এলাকার মাত্র ১২ বছরের শিশু নূপুর পারিবারিক কলহের জেরে অভিমানে আত্মহত্যা করে। 

একই বছরের ১১ জানুয়ারি সদর উপজেলার বদরখালী ইউনিয়নের বদরখালী গ্রামের বেড়িবাঁধের একটি গাছ থেকে মাতুব্বর (৫৫) নামের এক কৃষকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে পুলিশের তদন্তে জানা যায়, ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে আত্মহত্যা করেন দুলাল। 

যে কেউ চাইলেই কিনতে পারেনগ্যাস ট্যাবলেট’ 

বেশির ভাগ নারীপুরুষেরাই সহজলভ্যঅ্যালুমিনিয়াম ফসফাইডপান করে আত্মহত্যা করছেন। স্থানীয়ভাবে যার নামগ্যাস ট্যাবলেট কৃষকেরা সংরক্ষিত ধান, চাল ডাল কীটনাশক মুক্ত রাখতে ট্যাবলেট জাতীয় এই কীটনাশক ব্যবহার করেন। প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই এই গ্যাস ট্যাবলেট থাকে। 

বরগুনা শহর গ্রামাঞ্চলে সরকারের কৃষি বিভাগ অনুমোদিত কীটনাশক বিক্রেতাদের (ডিলারদের) কাছে যে কেউ গিয়েগ্যাস ট্যাবলেটনাম বললেই এই কীটনাশক কিনতে পারেন। 

কয়েকজন কীটনাশক বিক্রেতা প্রতিবেদককে জানান, গ্যাস ট্যাবলেট জাতীয় কীটনাশক মূলত গেরস্তের বাড়িতে ধানচাল কীটনাশক মুক্ত রাখতে ব্যবহার করা হয়। কৃষকেরা কিনে নিয়ে বাড়িতে রেখেও দেন অনেকে। অন্য সব কীটনাশক বিক্রিতে যেমননিয়ম, গ্যাস ট্যাবলেট বিক্রির ক্ষেত্রেও একই। তবে নারীরা কেউ কিনতে আসলে জেনেবুঝে বিক্রি করা হয়।  

সার্বিক বিষয়ে বরগুনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলী আহম্মেদ বলেন, ‘প্রতিটি আত্মহত্যার ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়। আমরা তদন্ত করে আদালতের কাছে প্রতিবেদন দিই। আমরা তদন্তে দেখেছি, বেশির ভাগ আত্মহত্যাই পারিবারিক কলহের জের, ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন, হতাশা, প্রতারণা আর্থসামাজিক কারণে হয়ে থাকে।

বরগুনায় আত্মহত্যা প্রবণতা বৃদ্ধির কথা স্বীকার করে পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আমরা কমিউনিটি পুলিশিং বিগ পুলিশিংয়ের মধ্য দিয়ে আত্মহত্যার বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করছি। ছাড়া আত্মহত্যার উপাদানগুলো সহজলভ্য কিনা বা বিষয়ে বিক্রির কোনো বিধিবিধান রয়েছে কি না, আমরা বিষয়গুলো খোঁজ নিয়ে দেখব। বিষয়ে অভিভাবক এবং সমাজের সচেতন ব্যক্তিদেরও কাজ করতে হবে।

বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে সহকারী ডোম হিসেবে কাজ করেন মালেক ফকির। তিনি বলেন, ‘আত্মহত্যার ঘটনায় মর্গে আসা অধিকাংশ মরদেহের পাকস্থলীতে গ্যাস ট্যাবলেট নামের একপ্রকার মারাত্মক বিষ পাওয়া যায়। যা পান করার পরপরই বিষক্রিয়া গোটা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ছাড়া বাকিরা প্রায় সবই ঝুলন্ত রশি বা কাপড়ের টুকরায় গলায় ফাঁস দিয়ে মারা যান।

বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ লোকমান হাকিম বলেন, ‘বরগুনায় আত্মহত্যার হার বেড়েছে।এখানে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১০টিরও বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। আত্মহত্যা আসলে মনস্তাত্ত্বিক সামাজিক ব্যাধি। এর প্রতিরোধও সম্মিলিত সামাজিকভাবে করতে হবে। আমাদের প্রতিনিয়তই আত্মহত্যার পোস্টমর্টেম করতে হচ্ছে। আবার কাউকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করতে হয়। আমি বলব এটা প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই।

বরগুনা সদর উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শায়লা আহসানের সঙ্গে কথা হয় আত্মহত্যার বিষয়ে। তিনিবলেন, আত্মহত্যা একটি মনস্তাত্ত্বিক সামাজিক ব্যাধি। প্রথমে ব্যক্তি ঘুমের ওষুধ সেবনে আসক্ত হয়ে পড়েন। ঘুমের ওষুধ বিষণ্নতা আরও বাড়িয়ে দেয় এবং আত্মহত্যার দিকে ধাবিত করে। অধিকাংশ নারীই পারিবারিক বিরোধের কারণে আত্মহত্যা করেন। এর মধ্যে কিশোরকিশোরী তরুণতরুণীদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েনও বড় কারণ।

ডা. শায়লা আহসান আরও বলেন, ‘আমাদের সমাজব্যবস্থায় এখনো ব্যক্তিগত সমস্যার বিষয়ে পরিবারের সঙ্গে খোলামেলাআলোচনা করার সুযোগ যেমন নেই। অভিভাবকেরাও অনেকে ছেলেমেয়েকে শাসনের ক্ষেত্রে শুধু শাস্তিমূলক মনোভাবে স্থির।সামাজিক এই ব্যাধি দূর করতে জেলা পর্যায়ে সমাজসেবার কাউন্সেলিং চালু থাকলেও অনেকে জানেন না বা আসতেও চান না। সমস্যা সমাধানে প্রথমেই পরিবারকে সচেতন হতে হবে। পরবর্তীকালে সামাজিক প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগওকাজে লাগাতে হবে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন জাগো নারীর নির্বাহী পরিচালক হোসনেয়ারা হাসি বলেন, ‘উপকূলীয় জেলা বরগুনার প্রত্যন্তঅঞ্চলগুলোতে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। বিষয়ে এখনই সচেতনতা মূলক কর্মসূচি হাতে নেওয়া জরুরি। গত কয়েক বছরে আমরা আত্মহত্যার যে প্রবণতা দেখছি, তা রীতিরমতো ভয়াবহ শঙ্কাজনক পর্যায়ে।


নিউজ টি শেয়ার করুন..

সর্বশেষ খবর

আরো খবর